গণমাধ্যমের স্বাধীনতা – সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও দায়বদ্ধতা

জুন ১৯ ২০১৮, ১১:৩০

যে সমাজে গণমাধ্যম মুক্ত, মত প্রকাশের স্বাধীনতা বিদ্যমান সে সমাজই আলোকিত। গণ মাধ্যমের উচিত সুষ্টু তথ্য ভিত্তিক সংবাদ পরিবেশন করা। দুর্নীতি দমনসহ বিভিন্ন বিষয়ে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া দেশের গণতন্ত্র বিকাশ লাভ করে না। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অর্থ সবকিছু রিপোর্টিং করার অধিকার নয়। জনস্বার্থের বিষয়গুলিই মূখ্যত এ স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান হওয়া উচিত নিরপেক্ষ। এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় কোন হস্তক্ষেপ থাকা উচিত নয়। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে হলুদ সাংবাদিকতাও হয়। হলুদ সাংবাদিকতার উপরে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকাও উচিত।

প্রকৃতপক্ষে সাংবাদিকতা হলো এক প্রকার জীবনাদর্শ। এক ধরনের মিশন। সাংবাদিকতার দায়বদ্ধতা সর্বপ্রথম সত্যের কাছে। তারপর একজন সাংবাদিক দায়বদ্ধ সমাজের কাছে। সমাজে সত্য প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব নিয়েই একজন সাংবাদিকের কাজ শুরু করা উচিত। সাংবাদিকরা হলেন গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের কারিগর। সত্য যত বেদনাদায়কই হোক না কেন তার উদঘাটন এবং নির্মোহভাবে পাঠকের কাছে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা একজন সংবাদকর্মীর প্রধান কর্তব্য হওয়া উচিত।

সাংবাদিকতা হলো চ্যালেঞ্জিং পেশা। সম্মানজনক পেশা হিসেবেও এটি বিশ্বব্যাপি সমাদৃত। যাবতীয় তথ্য ও ঘটনা বস্তুনিষ্ঠতার সাথে পাঠকের কাছে পরিবেশন করতে সাংবাদিকদের দায়িত্বশীলতার কোন বিকল্প নাই। সাংবাদিকদের কাজ হলো সমাজের সঠিক চিত্র জাতির সামনে উপস্থাপন করা। সমাজের নানা অসংগতি ও ঘটনা জাতির সামনে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরাই তাদের পেশাগত দায়িত্ব। এ কারণে সাংবাদিকদের সমাজের দর্পন বলা হয়। নির্যাতিত মানুষ শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে সাংবাদিকদের দ্বারস্থ হয়। একজন নির্যাতিত ও নিরাপত্তাহীন ব্যক্তির যখন কোথাও দাঁড়াবার জায়গা থাকে না তখন আশার প্রদীপ হয়ে যে মানুষটি তার মনে বিরাজ করে তিনি একজন সাংবাদিক। অন্যদিকে পুলিশের কাজ হলো জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা । এই অর্থে সাংবাদিক ও পুলিশ একই দায়িত্ব পালন করেন। সুতরাং দেশের সাংবাদিক সমাজ পুলিশের দ্বারা নির্যাতিত হতে পারে না। সাংবাদিকরা যখন পুলিশের হাতে নির্যাতিত হন স্বাভাবিকভাবেই দেশের মানুষের মনে উৎকন্ঠা বেড়ে যায়। সব সরকারের আমলেই অতি উৎসাহী পুলিশরা এ কাজটি করে থাকেন। তবে কোনো সরকারের জন্যই এটা স্বস্তিজনক নয়। দেশের সার্বিক আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করার জন্য যেমন পুলিশ তেমনি আইন শৃঙ্খলা বিঘিœত হলে এবং দেশের যাবতীয় ভালোমন্দের খবরাখবর নির্মোহভাবে দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব সাংবাদিক সমাজের। দেশের অগ্রগতির সঙ্গে সাংবাদিক সমাজ ও পুলিশ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। পরিশ্রম, সততা ও সাহস এর মাধ্যমে একজন সাংবাদিককে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে তাদেরকে ঘরের বাহিরেই অধিক সময় ব্যয় করতে হয়। পাশাপাশি একজন পুলিশ অফিসারকেও দায়িত্ব পালন করতে রাস্তাঘাটেই বেশি সময় কাটাতে হয়। সুতরাং পুলিশ ও সাংবাদিকদের সু-সম্পর্ক বাঞ্ছনীয়।

সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করার ব্যাপারে পত্রিকার মালিক, সরকার সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ভাবতে হবে। সংবাদপত্রের প্রাণ হলো সাংবাদিক। বাংলাদেশ এখন সামগ্রিকভাবে এগিয়ে চলছে। এগিয়ে চলার এ ধারাকে অব্যাহত রাখতে হলে স্বাধীন ও মুক্ত সাংবাদিকতা প্রয়োজন। সাংবাদিক সমাজ নিগৃহীত হলে এবং তাদের নিরাপত্তা না থাকলে দেশের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে। একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম একটি গণতান্ত্রিক দেশের অন্যতম চালিকাশক্তি। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন সহ প্রতিটি আন্দোলনে সাংবাদিক সমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন সহ ইতিহাসের প্রত্যেক ক্রান্তিলগ্নে সাংবাদিক ও লেখকরা মরণপন অবদান রেখেছেন। সাংবাদিক সমাজকে জাতির বিবেক বলা হয়। সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমকে বিকল্প পার্লামেন্ট হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। গণতন্ত্রের সত্যিকার রূপ দেখতে চাইলে সাংবাদিকদের সঠিকভাবে কাজ করতে দিতে হবে। বস্তুনিষ্ঠভাবে সংবাদ প্রকাশ করার পূর্ণস্বাধীনতা ও নিরাপত্তা দিতে হবে। গণমাধ্যম ও সংবাদপত্র যদি স্বাধীন হয় তাহলে সকল মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন এর বিখ্যাত উক্তি হলো “The all security of all is in free press”. অর্থাৎ সকলের সকল নিরাপত্তা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মধ্যে নিহিত। মানুষের অধিকার সংরক্ষণ করার সবচাইতে শক্তিশালী মাধ্যমগুলো হলো প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া। খ্যাতিমান সাংবাদিক ও আমেরিকার গণমাধ্যমের কড়া সমালোচক বিল মায়ার্স যথার্থই বলেছে “There is no more important struggle for democracy then ensuring a diverse independent and free media. Free press is the heart of the struggle.” অর্থাৎ একটি বহুমাত্রিক ও উন্মুক্ত গণমাধ্যমের প্রতিষ্ঠার চেয়ে গণতন্ত্রের জন্য আর কোন প্রয়োজনীয় আন্দোলন হতে পারে না। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হলো সে আন্দোলনের প্রাণ। রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ এবং এর পরেই চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে সংবাদপত্রকে আখ্যায়িত করা হয়। সংবাদপত্র হচ্ছে সবচাইতে শক্তিশালী গণমাধ্যম। সাংবাদিকদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করার সুযোগ করে দেয়া রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। তাঁদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহ অধিকারের বিষয়গুলো থেকে তাঁরা যেন বঞ্চিত না হয় তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্র পরিচালকের দায়- এ বিষয়টি দায়িত্বশীলরা যত বেশি মাথায় রাখবেন ততই দেশ ও দেশের মানুষের জন্য মঙ্গল হবে নি:সন্দেহে।

সাংবাদিকদের যে কোন মূল্যে জনস্বার্থের বিষয়টি সমুন্নত রেখে নৈতিক রীতিনীতি মেনে নির্ভীক ও নিরপেক্ষ থাকতে হবে। সংবাদপত্র যতই দল নিরপেক্ষ থাকবে, সাংবাদিক যতই নিরপেক্ষ থাকবে ততই দেশের জন্য মঙ্গল হবে। সত্য ও বস্তুনিষ্ট সংবাদ পরিবেশন করার পাশাপাশি গণমানুষের কথাও প্রকাশ করতে হবে। তাহলে যে কোন গণমাধ্যম বা সংবাদপত্র দ্রুত পাঠক প্রিয় হয়ে উঠবে। গণমাধ্যমের অগ্রগতি উন্নয়নের মাইল ফলক। নোবেল বিজয়ী বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য সেনের মতে দূর্ভিক্ষ ঠেকানোর ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা রয়েছে।

সাংবাদিকতা পেশা সকল বিচারেই ব্যতিক্রমধর্মী পেশা। এ পেশাই দাবি করে সাংবাদিকদের কমিটমেন্ট। আর কমিটমেন্ট হচ্ছে জনকল্যানের জন্য কমিটমেন্ট। এ জন্যই বলা হয় সাংবাদিকদের কোন বন্ধু নেই। সংবাদপত্র সমাজের দর্পন হয়ে উঠে তখনই যখন সাংবাদিকরা সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে ভূমিকা রাখেন। সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠতা, নীতিনৈতিকতা , বিবেক ও বুদ্ধি ব্যক্তিস্বার্থের কাছে যেন বন্দী না হয় সে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সকলকে লক্ষ্য রেখেই সংবাদ পরিবেশন করতে হবে। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার জন্য তথ্য অধিকার আইনের প্রয়োজনীয়তাও অনস্বীকার্য। আমাদের দেশে তথ্য অধিকার আইন রয়েছে। এ আইনটি যথাযথ প্রয়োগ হলে সাংবাদিক সমাজ তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন আরও সহজভাবে করতে পারবেন। তারা অত্যন্ত সফলভাবে জন প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হবেন। গণ- মাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের দায়িত্ববোধ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও প্রহসনে পরিণত হয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অপব্যবহারও রোধ করা প্রয়োজন নির্মোহ সাংবাদিকতার স্বার্থেই। সাংবাদিকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। তা না হলে সাংবাদিকরা দেশের জন্য কাংখিত অবদান রাখতে ব্যর্থ হবে।

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রূনির নৃশংস হত্যাকান্ডে দেশের মানুষ হতবাক হয়েছিল। সাংবাদিক দম্পতি হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে দেশের মানুষের তাই প্রত্যাশা করেছিল।

পার্লামেন্ট যেমন একটি গণতান্ত্রিক দেশে জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতীক, তেমনি গণতান্ত্রিক দেশে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংবাদপত্রের সম্পাদক তার কাগজের অগণিত পাঠক তথা দেশের এক বিরাট সংখ্যক মানুষের সার্বভৌমত্বের প্রতীক বা প্রতিনিধি। একথা বলেছিলেন কলকাতার এককালের বিখ্যাত সম্পাদক বিবেকান্দ মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেছিলেন একটি দৈনিকের সম্পাদক হিসেবে আমি আমার পাঠকের কাছে দায়বদ্ধ। তেমনি এই কাগজের সাংবাদিকদের দায়বদ্ধতা আমার কাছেও।

পরিশেষে বলা যায়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্থ হলে গণতন্ত্রের বিকাশও বাধাগ্রস্থ হবে। বাংলাদেশের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া যথার্থ অর্থেই দেশের মানুষের নির্ভরযোগ্য আশ্রয়কেন্দ্র ও নির্ভরতার প্রতীক হউক।

মোহাম্মদ আবু তাহের
লেখক ও ব্যাংকার

  •