কুলাউড়ায় আরেক সিরাজের উত্থান! কুলাউড়া জালালিয়া মাদ্রাসা সুপারের অনৈতিকতায় রহস্যজনক কারণে নিরব কর্তৃপক্ষ

জানুয়ারি ০৯ ২০২০, ১৯:০০

নিজস্ব প্রতিনিধি: কুলাউড়ায় জালালীয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার মাওঃ আবদুস শহীদ যেন ফেনীর আরেক সিরাজোদ্দৌলা। তার বিরুদ্ধে মাদ্রাসার ছাত্রীদের শ্লীলতাহানী, যৌন হয়রানী, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের নির্দেশনা অমান্য, মেয়াদোত্তীর্ণ পরিচালনা কমিটি দিয়ে মাদ্রাসা পরিচালনা ইত্যাদি অনৈতিকতা-অনিয়মসহ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারাধীন মামলার তদন্তে অপরাধী প্রমানীত হলেও দীর্ঘদিন যাবৎ রহস্যজনক নিরবতা পালণ করছেন কর্তৃপক্ষ। তাই, বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকমহল। ফলে, মাদ্রাসায় বিরাজমান অচলাবস্থার কারণে ব্যাহত হচ্ছে দীনি শিক্ষা কার্যক্রম।
জানা গেছে, জালালীয়া দাখিল মাদ্রাসার ৬ষ্ঠ, ৭ম, ৮ম ও ৯ম শ্রেণীর ৭ জন ছাত্রী দীর্ঘদিন থেকে মাদ্রাসা সুপার মাওঃ আবদুস শহীদের যৌন হয়রানীর শিকার হলে ওই শ্রেণীসমূহের ১৫ জন শিক্ষার্থী গত ৩১ অক্টোবর ২০১৮ সালে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ করে। সুপারের অশালীন আচরণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ৯ম শ্রেণীর এক ছাত্রী গত ০১ নভেম্বর ২০১৮ সালে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ করে। একইদিন বিকালে ওই ছাত্রীর পিতাও উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন।
এর আগে, ঘটনা জানাজানি হলে অভিভাবক সদস্য আতিকুর রহমান আখইসহ মাদ্রাসার ২ জন শিক্ষক ক্লাসে গিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে ধমক দিয়ে বলেন, এটা মাদ্রাসার বিষয় মাদ্রাসায়ই মিমাংসা হবে। বিষয়টি নিয়ে আর বাড়াবাড়ি করবেনা। ওইদিনই বিকালে তারা ৯ম শ্রেণীর ওই ছাত্রীর বাড়িতে গিয়ে একটি কাগজে তার স্বাক্ষর নেন। অথচ, মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. আব্দুর রউফ সেই অভিভাবক সদস্য আতিকুর রহমান আখইকে আহবায়ক এবং ওই ২ জন শিক্ষক শামছুল ইসলাম খান ও মো. আব্দুস সামাদকে সদস্য করে ৩ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেন- যারা সুপার মাওঃ আব্দুস শহিদের পক্ষপাতদুষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন দেন।
এভাবেই, দীর্ঘদিনেও কোথাও কোন প্রতিকার না পেয়ে ওই ছাত্রীর পিতা ১৯ আগষ্ট ২০১৯ সালে মাদ্রাসা সুপার মাওঃ আব্দুস শহিদের বিরুদ্ধে মৌলভীবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করলে বিজ্ঞ ট্রাইব্যুনাল পিবিআই-কে ঘটনাটি তদন্তের নির্দেশ দেন। পিবিআই এর তদন্তে ঘটনার সত্যতাসহ সুপার মাওঃ আব্দুস শহিদের অনিয়ম-দূর্ণীতিও ধরা পড়েছে। সেইসাথে, মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. আব্দুর রউফের গঠিত তদন্ত কমিটির দেয়া তদন্ত প্রতিবেদনটি সুপার মাওঃ আব্দুস শহিদের পক্ষপাতদুষ্ট মর্মেও প্রমান পাওয়া গেছে। অভিযোগ উঠেছে, মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. আব্দুর রউফ ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে নিজ এলাকার বাসিন্দা মাওঃ আব্দুস শহীদকে সুপার পদে নিয়োগ করেছেন। তার প্রভাবেই পরিচালনা কমিটির কিছু অসাধু সদস্যের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সুপার মাওঃ আব্দুস শহীদ মাদ্রাসায় অনৈতিকতা, অনিয়ম, দূর্ণীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার রামরাজত্ব কায়েম করেছেন। তার অনৈতিকতা, অনিয়ম, দূর্ণীতি ও স্বেচ্ছাচারিতায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন এলাকার জনসাধারণ।
অপরদিকে, মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটি নির্বাচনের জন্য কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার গত ১৭/০৬/২০১৯ইং তারিখের ০৫.৬০.৫৮৬৫.০০১.০৭.০০২.১৯-৫৮৬ (ক)নং স্মারকে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগ করেন। এর প্রেক্ষিতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার গত ২০/০৬/২০১৯ইং তারিখের ৩৭.০২.৫৮৬৫.০০.০০০.৩২০.১৯-৪৫৭নং স্মারকে মাদ্রাসার সুপারকে ‘মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটি নির্বাচনের লক্ষ্যে তফশীল ঘোষণার জন্য তথ্য প্রদানে সহযোগীতা’ প্রসঙ্গে অনুরোধ জানান। কিন্তু, মাদ্রাসা সুপার গত ০১/০৭/২০১৯ইং তারিখে বোর্ড কর্তৃক কমিটি অনুমোদনের কপি প্রদান করলেও অন্যান্য তথ্যাদি প্রদান না করায় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার গত ০৯/০৭/২০১৯ইং তারিখের ৩৭.০২.৫৮৬৫.০০.০০০.৩২০.১৭-৪৬৪নং স্মারকে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে ‘মাদ্রাসা সুপার কর্তৃক তথ্য প্রদানে সহযোগীতা না করণ প্রসঙ্গে’ অবহিত করলে, উপজেলা নির্বাহী অফিসার গত ১১/০৭/২০১৯ইং তারিখের ০৫.৬০.৫৮৬৫.০০১.০৭.০০২.২০১৬-৬৮৬ (ক)নং স্মারকে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে ‘বিধি মোতাবেক নির্বাচন সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য’ পুণরায় অনুরোধ জানান। পরবর্তীতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার গত ২১/০৭/২০১৯ইং তারিখের ৩৭.০২.৫৮৬৫.০০.০০০.৩২০.১৭-৪৭১নং স্মারকে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে ‘মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটি নির্বাচন পরিচালনায় সময়ের বাধ্যবাধকতা থাকা প্রসঙ্গে’ অবহিত করেন। এরপর, মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটি নির্বাচনের আর কোন কার্যক্রম না হওয়ায় জনতা ব্যাংক লিমিটেড এর ব্যবস্থাপক গত ১৯/০৮/২০১৯ইং তারিখের কুলা/তাআ/জালালীয়া মাদ্রাসা/তথ্য/২০১৯নং সূত্রে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে ‘মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির প্রকৃত তথ্য প্রদান ও আমাদের করণীয় প্রসঙ্গে’ নির্দেশনা চান। কিন্তু, কোন নির্দেশনা না পাওয়ায় জনতা ব্যাংক লিমিটেড মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতন প্রদান বন্ধ রেখেছে। মাদ্রাসার এহেন অচলাবস্থার সৃষ্টি হলে অভিভাবকবৃন্দের পক্ষে আঃ রহিম খান, তাহির, গফুর আলী, ইব্রাহীম, ফারুক, জব্বার, কমলা, ছাপা, ও সেলিম গত ১৩/১০/২০১৯ইং তারিখে চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ শিক্ষাবোর্ড, ঢাকা বরাবর ‘মেয়াদোত্তীর্ণ (অবৈধ) কমিটি দ্বারা মাদ্রাসা পরিচালনা প্রসঙ্গে’ শীর্ষক অভিযোগ প্রেরণ করেন।
এব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এটিএম ফরহাদ চৌধুরী এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনের ব্যাপারে মাদ্রাসার সুপারকে কয়েকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের প্রস্তুতির ব্যাপারে সুপারের দায়িত্ব রয়েছে। দায়িত্বে অবহেলা করলে তার বিরোদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এব্যাপারে মাদ্রাসা সুপার মাও আবদুস শহীদ এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, শুনেছি ম্যানেজিং কমিটি নিয়ে হাইকোর্টে মামলা রয়েছে। তাই নির্বাচনের দিকে যাচ্ছি না। তবে মামলা সংক্রান্ত কাজগপত্র দেখাতে চাইলে তিনি এ প্রতিবেদককে তা দেখাতে ব্যর্থ হন।
এতকিছুর পরও অদ্যাবধি মাদ্রাসাটির ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা না নেয়ার বিষয়টি রহস্যজনক। একজন অসৎ সুপারের কারণে একটি ঐতিহ্যবাহী দীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এ অচলাবস্থা কিছুতেই মেনে নেয়া যায়না। প্রয়োজনে বিচার বিভাগীয় তদন্তপূর্বক জরুরী ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিয়ে দীনি শিক্ষার এ প্রতিষ্ঠানটিকে ধংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য আকুল আবেদন জানাচ্ছেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসী।

  •