মৌলভীবাজারের রাজনগরে আমন ধান ক্রয়ে অনিয়ম নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউএনও’র অন্তঃবিরোধ চরমে

জানুয়ারি ১৮ ২০২০, ২০:১৬

এস.এম. সাব্বির আলম: মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলায় আমন ধান ক্রয়ে অনিয়ম নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউএনও’র অন্তঃবিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে , এতে প্রকৃত কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছে। ১৫ ও ১৬ই জানুয়ারি বিক্ষোভ ও নৈরাজ্যের মূলে রয়েছে রাজনগর উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মধ্যকার অন্তঃবিরোধ ও সরকারীভাবে আমন ধান ক্রয়ের তালিকা নয়ছয়করণ। উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার অন্তঃবিরোধের বিষয়টি প্রকাশ না করলেও, উপজেলা নির্বাহী অফিসার লটারীর মাধ্যমে বাছাইকৃত কৃষক তালিকা বাতিল করে নতুনভাবে তালিকা প্রণয়ন করার পর প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্প- ২ এর ঘর তৈরীতে অনিয়মের অজুহাতে পরোক্ষভাবে উপজেলা চেয়ারম্যানের অবস্থান উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বিরুদ্ধে হওয়ায়, সর্বোপরী উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বিরুদ্ধে একটি চক্রের বিক্ষোভ প্রদর্শন উভয়ের মধ্যকার অন্তঃবিরোধের বিষয়টি পরিষ্কার করে দিয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এ বছর সরকারীভাবে উপজেলা থেকে ১ হাজার ৪শ ১৭ টন আমন ধান ক্রয়ের লক্ষ্যে উপজেলার সাড়ে ৯ হাজার কৃষক ধান বিক্রেতা হিসাবে তালিকাভূক্ত হন। ইউনিয়ন কৃষি কর্মকর্তাগণের প্রস্তুতকৃত এ তালিকা থেকে লটারী করে ১ হাজার ৪শ ১৭ জন কৃষককে ধান বিক্রেতা হিসাবে মনোনীত করা হয়। কিন্তু, লটারীর মাধ্যমে বাছাইকৃত কৃষক তালিকা নিয়ে দেখা দেয় বিভ্রান্তি। আমনধান চাষাবাদ করতে পারেনি কিংবা আমন ধানের জমিই নেই, এমন অনেকের নাম রয়েছে লটারীকৃত তালিকায়। অভিযোগ ওঠে- একটি চক্র আমন চাষ করেনি এমন চাষীদের কার্ড অল্প টাকায় ক্রয় করে বিক্রেতা তালিকায় নাম তুলেছে। মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের যোগসাজসে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেট কৌশলে আমন চাষীদের বাইরে বোরো চাষী, সবজি চাষীদের কৃষিকার্ড হাতিয়ে নিয়ে এদের তালিকাভূক্ত করায় প্রকৃত কৃষকরা মূল তালিকা থেকে বাদ পড়েন। ওই তালিকায় একজন কৃষকের নাম এসেছে একাধিকবার। একই মোবাইল ফোন নম্বর ব্যবহার করেছেন একাধিকজন। এর মধ্যে ১টি ফোন নম্বর ব্যবহার করেছেন ৫৭ জন। উত্তরভাগ ইউনিয়নের উত্তরভাগ গ্রামের ১শ ৫৮ জন কৃষকের মধ্যে অর্ধেকের বেশী ভুয়া কৃষক। শুধুমাত্র ফতেপুর ইউনিয়নে লটারীতে অংশ নেয়া ২শ ২৫ জন কৃষকের মধ্যে মনোনীত ৩৬ জনের মধ্যে ২০ জনই ভুয়া কৃষক- যাদের আমন চাষ নেই এবং এদের কেউ কেউ বিদেশে থাকেন। জনশ্র“তি রয়েছে, কোন কোন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও সরকার দলীয় উপজেলা পর্যায়ের একশ্রেনীর নেতৃবৃন্দ রয়েছেন এ চক্রটির নেপথ্যে। এই চিত্র উপজেলার সবকটি ইউনিয়নের। ফলে, উপজেলায় সরকারীভাবে ধান ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে সৃষ্টি হয় চরম বিভ্রান্তি।
বিষয়টি নজরে এলে কঠোর অবস্থান নেন উপজেলা ধান সংগ্রহ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফেরদৌসী আক্তার। তিনি উপজেলা কৃষি অফিসারের নিকট থেকে মূল তালিকা নিয়ে চুড়ান্ত তালিকার সাথে মিলিয়ে দেখতে পান দু’টি তালিকার মধ্যে মিল নেই। এমতাবস্থায়, তিনি বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন এবং লটারীর মাধ্যমে বাছাইকৃত তালিকা বাতিল করে নতুনভাবে তালিকা প্রণয়নের নির্দেশ দেন। এর পর পরই, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্প- ২ এর অধিনে ঘর তৈরীতে অনিয়মের অজুহাতে পরোক্ষভাবে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্প- ২ বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফেরদৌসী আক্তারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন উপজেলা চেয়ারম্যান শাহজাহান খান। অপরদিকে, নতুন তালিকা তৈরী সম্পন্ন হবার পর দুই তালিকাকে কেন্দ্র করে একটি চক্র গত ১৫ জানুয়ারী বুধবার রাজনগরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এদিকে, ধান ক্রয়-বিক্রয় তালিকায় অনিয়মের বিষয় তদন্তে ১টি কমিটি গঠন করেন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং ওই কমিটি গত ১৬ জানুয়ারী তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে। উপজেলা চেয়ারম্যান শাহজাহান খান ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফেরদৌসী আক্তার তাদের মধ্যকার অন্তঃবিরোধের বিষয়টি প্রকাশ না করলেও, প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্প- ২ এর ঘর তৈরীতে অনিয়মের অজুহাতে উপজেলা চেয়ারম্যান পরোক্ষভাবে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং ১৫ জানুয়ারী উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বিরুদ্ধে একটি চক্রের বিক্ষোভ প্রদর্শনের ঘটনাটিই উভয়ের মধ্যকার অন্তঃবিরোধের বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছে।

উপজেলা চেয়ারম্যান শাহজান খান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনেক দূর্ণীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এনিয়ে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। আমি নিজেও দূর্ণীতির অভিযোগ শুনে কয়েকটি ঘর পরিদর্শন করেছি এবং অনেক ঘরে দরজা জানালা দেওয়া হয়নি। ধান ক্রয় নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান জানান, আমি এই কমিটিতে উপদেষ্টা মাত্র। ধান ক্রয় স্থগিত করায় কৃষকরা বিক্ষোভ করেছে। দূর্ণীতি হয়ে থাকলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা ধান সংগ্রহ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌসি আক্তার বলেন, বিষয়টি দু:খজনক। কিছু ধান ক্রয়ের পর অনিয়মের অভিযোগ শুনে আমি ধান ক্রয় বন্ধ করার আদেশ দেই এবং আমন ধান বিক্রয়ের আরেকটি কৃষক তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছি। সহকারি কমিশনার (ভূমি) উর্মি রায়,কে প্রধান করে ৩সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৩ কার্য দিবসের পর রিপোর্ট আসলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পরবর্তীতে সংশোধিত তালিকা থেকে আরেকটি লটারি করা হবে। তখন আর প্রকৃত আমন চাষিরা বঞ্চিত হবেন না। আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পে কোন অনিয়ম হয়নি। প্রকল্প গুলোর কাজ চলমান রয়েছে। প্রথম ধাপের ৮৯টি ও দ্বিতীয় ধাপের ৫৫টি ঘরের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। মূলত একটি সিন্ডিকেটের কারণে কাজ শেষ করতে বিলম্ব হচ্ছে। ধান ক্রয়ে সিন্ডিকেট সনাক্ত করে ধান ক্রয় বন্ধ করার কারণে ঐ সিন্ডিকেট বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। নকসায় টিনের বেড়া দিয়ে ঘর নির্মাণের কথা থাকলেও আমি এই বাজেটেই পাকা দালান ঘর নির্মাণ করে দিচ্ছি। তাই কাজ শেষ করতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।

রাজনগর উপজেলা কৃষি কর্মকতা মোঃ শাহাদুল ইসলাম তালিকায় অসংগতির অভিযোগ স্বীকার করে বলেন, লটারিতে নির্বাচিত কৃষক তালিকা অধিকতর যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। প্রকৃত আমন চাষি না হলে কার্ড জব্দ করা হচ্ছে। এরমধ্যে অনেক কার্ড জব্দ করা হয়েছে। আর তালিকা তৈরি করার কাজে জড়িতদের চিহ্নিত করতে কাজ চলছে।

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আব্দুন নূর জানান, কৃষি অফিস থেকে প্রাপ্ত তালিকা থেকে লটারির মাধ্যমে বিজয়ী কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করেন রাজনগর খাদ্য গুদামের ওসি এলএসডি অসীম কুমার তালুকদার। তালিকা তৈরিতে তিনি কোন অনিয়ম করে থাকলে তদন্তে বেরিয়ে আসবে।

এব্যাপারে উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মিলন বখত এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ধান ক্রয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করে প্রকৃত চাষীদের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের ব্যাপারে দলের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হচ্ছে।

এব্যাপারে রাজনগর খাদ্য গুদামের ওসি এলএসডি অসীম কুমার তালুকদার জানান, আমি কৃষক তালিকা প্রস্তুত কিংবা লটারিতেও সংযুক্ত নই। আমাকে যে তালিকা দেওয়া হয়েছিল তা থেকেই আমি সম্পন্ন করে দিয়েছি। এসব অনিয়মে আমার কোন হাত নেই।

  •