• ২০শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ১২ই জিলকদ, ১৪৪৫ হিজরি

মৌলভীবাজারের নুদার জাতীয় স্যাটেলাইট অভিযান প্রতিযোগিতায় বিজয়ী

admin
প্রকাশিত এপ্রিল ২৫, ২০২৪
মৌলভীবাজারের নুদার জাতীয় স্যাটেলাইট অভিযান প্রতিযোগিতায় বিজয়ী

শাহনেওয়াজ চৌধুরী সুমন :  IEEE এরোস্পেস অ্যান্ড ইলেকট্রনিক সিস্টেম সোসাইটি BRACU Student Branch Chapter দ্বারা আয়োজিত তৃতীয় জাতীয় স্যাটেলাইট অভিযান প্রতিযোগিতায় চূড়ান্ত বিজয়ী দল ‘টিম অ্যাস্ট্রো থ্রাস্ট’ সাথে অংশগ্রহণ করে বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন করে মৌলভীবাজারের ছেলে নুদার । ২০ এপ্রিল (শনিবার) ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির লেকচার হলে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় ।

IEEE Aerospace and Electronic System Society BRACU Student Branch Chapter এর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে জানা যায় ‘স্যাটেলাইট অভিযান প্রতিযোগিতা হল একটি ফ্ল্যাগশিপ প্রতিযোগিতা । সারা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিযোগিতাটিতে স্বতন্ত্র একটি ধারণা ও নিজস্ব উৎপাদন পরিকল্পনা এবং গুরুত্বপূর্ণ কৌশল দলীয় নেতৃত্বের মাধ্যমে যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়।‌ এটি দেশের সবচেয়ে বড় স্যাটেলাইট মিশন আইডিয়া প্রতিযোগিতা, যেখানে অংশগ্রহণ করেন স্যাটেলাইট বিষয়ক বিশ্লেষণে উৎসাহীরা । আই.ইউ.টি, বুয়েট, সাস্ট, ব্র্যাক, আই.আই.ইউ.সি এর মত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মেধাবী শিক্ষার্থীরা ৮টি দলে প্রথম রাউন্ডে অংশগ্রহণ করেন জাতীয় স্যাটেলাইট অভিযান প্রতিযোগিতায়।’

যা বছরে একবার IEEE এরোস্পেস অ্যান্ড ইলেকট্রনিক সিস্টেম সোসাইটি BRACU  Student Branch Chapter দ্বারা ইন্ট্রো টু এসইসি সেশনটি আয়োজিত হয়। এটি মূলত স্পেস সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির ল্যাবরেটরি-ল্যাসেট-এর সহযোগিতায় এবং ইউনিসেক-গ্লোবাল এবং ইউনিসেক-বাংলাদেশের অংশীদারিত্বে এটি আয়োজিত হয় । ভবিষ্যৎ স্যাটেলাইট গুলোর টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যেই (SDGs) মূলত এমন আয়োজন ।

ফেজ-১ এ অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে একটি কঠোর পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার পর, ৪টি দলকে চূড়ান্ত রাউন্ডের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল । সেখান থেকে বাছাইকৃতদের নিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাইনাল রাউন্ড অনুষ্ঠিত হয় । আয়োজনটির মাধ্যমে মূলত প্রতিযোগীরা‌ স্যাটেলাইট মিশনে নিজেদের উদ্ভাবিত ধারণা প্রস্তাব করার সুযোগ পান । প্রথম রাউন্ডে উপস্থাপিত ধারনার বর্ণনা, প্রযুক্তিগত বিবরণ, কক্ষপথের তথ্য সম্পর্কিত গবেষণার লিখিত বিশ্লেষণ প্রদানের মাধ্যমে দ্বিতীয় রাউন্ডে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে হয় প্রত্যেক দলকে ।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ ও ২ এ কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে কিংবা এখনো কাজ করছেন এমন অভিজ্ঞ ও উচ্চ মাপের বিচারক মন্ডলীদের সম্মুখে নানা জটিল প্রশ্ন-উত্তর পর্বের মধ্য দিয়ে প্রত্যেক দলকে নিজেদের যোগ্যতার পরিচয় উপস্থাপন করতে হয়েছে ফাইনাল রাউন্ডে পৌঁছার জন্য । যেখানে দর্শক সারিও ছিল নানা গুণী মানুষের উপস্থিতিতে মুখরিত ।

বাংলাদেশি ন্যানো স্যাটেলাইট  ব্র্যাক অন্বেষা’র  মূল প্রকৌশলী ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রিপল-ই বিভাগের প্রভাষক এবং ল্যাসেটের পরিচালক আবদুল্লাহ হিল কাফি এবং রায়হানা শামস ইসলাম অন্তরা চমকপ্রদ এই অধিবেশনটির পরিচালনা করেন। এসইসি এর সূচনা অধিবেশনটি স্যাটেলাইটের উত্তেজনাপূর্ণ জগতের এক ঝলক দেখায় ।।যারা প্রতিযোগিতাটি অন্বেষণ করার জন্য প্রথমবারের মতো ইভেন্টে অংশ নিয়েছিলেন তাদের জন্য এটি একটি অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা । বক্তা এবং অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রশ্নোত্তর পর্ব একটি প্রাণবন্ত এবং ইন্টারেক্টিভ স্পর্শের অন্যরকম মাত্রা যোগ করে ।

“কসম্যাট্রিক্স : বিশ্ব এবং মহাকাশের সংযোগ স্থাপন” শিরোনামে আয়োজিত তৃতীয় জাতীয় স্যাটেলাইট অভিযান প্রতিযোগিতায় প্রথম রাউন্ডে এরোনক-২২, লাক্স অরবিস, টিম অ্যাস্ট্রো থ্রাস্ট, গ্রেমলিন, টিম কসমস ক্রিউ, ইথারিয়াল লুমিনারি, ট্রাইপড+১, নেবুলা নেভিগেটরস নামে ৮টি দল অংশগ্রহণ করে ।

বিজয়ী দল ‘টিম অ্যাস্ট্রো থ্রাস্ট’ এর অন্যতম সদস্য বখশ মোহাম্মদ মাহান্না মৌলভীবাজার এর সন্তান । সে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি, উভয় ক্ষেত্রেই গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে উত্তীর্ন হলেও পরবর্তীতে ‘ইসলামী ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজী (IUT) OIC’ তে স্কলারশীপ সহকারে ‘ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রোনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং’ এ স্হান করে নেয় । বর্তমানে সে দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যায়নরত ।

‘কুয়েত ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কোম্পানি’র মেকানিক্যাল মেনটেনেন্স ডিপার্টমেন্টের ইঞ্জিনিয়ার ‘মোহাম্মদ ওয়াদুদ বখশ ও ইসমত আরা মুন্নি’র জ্যেষ্ঠ সন্তান ‘বখশ মোহাম্মদ মাহান্না’ । বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা মৌলভীবাজার জেলা সদরে । পৈত্রিক নিবাস জেলা সদরের কমলা কলস গ্রামের ঐতিহ্যবাহী বখ্শ বাড়ি । পরিবার সহ সবাই তাকে নুদার নামেই ডাকেন। দুই ভাই বোনের মধ্যে বড় সন্তান নুদার, ওর ছোট বোন মাজান্নাহ ফাতিমা ওদুদ অষ্টম শ্রেণীর মেধাবী শিক্ষার্থী । পড়াশোনা পাশাপাশি নুদার গণিত প্রতিযোগিতা, রুবিক্স কিউব প্রতিযোগিতাসহ নানা খেলাধুলায়ও পারদর্শী ।

তৃতীয় জাতীয় স্যাটেলাইট অভিযান প্রতিযোগিতায় দক্ষতা ও সুপরিকল্পনার একটি অসাধারণ সংমিশ্রণ প্রদর্শন করে, এই চ্যালেঞ্জিং প্রতিযোগিতায় ‘টিম অ্যাস্ট্রো থ্রাস্ট’ তাদের নিরলস পরিশ্রম ও বুদ্ধিমত্তা দ্বারা অসাধারণ কৃতিত্বে আরোহণ করে ।  চূড়ান্ত রাউন্ডে প্রথম স্থান অর্জনকারী IUT এর ‘টিম অ্যাস্ট্রো থ্রাস্ট’ যৌথভাবে অংশগ্রহণ করেন এমডি মুশফিকুর রহমান (SWE’20), রাহাতুন নেসা (ME’21), মুনতাসির হোসেন (CSE’21) এবং বখশ মোহাম্মদ মাহন্না (EEE’21) । আর এমন জটিল প্রতিযোগিতায় টিম অ্যাস্ট্রো থ্রাস্ট’ “জেনন আয়ন থ্রাস্টার দ্বারা চালিত সার্কুলার সিন্থেটিক অ্যাপারচার রাডার (CSAR) স্যাটেলাইট ব্যবহার করে বঙ্গোপসাগরের অফশোর গ্যাস ক্ষেত্র বিশ্লেষণ” এর মত দারুন একটি আইডিয়া উপস্থাপন করে । যা দ্বারা হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আরেকটি সম্ভাবনার দ্বার খুলে যেতে পারে ।

এছাড়াও প্রতিযোগীরা একটি নিউরাল নেটওয়ার্কের সাহায্যে মহাকাশের প্রতিটি বিন্দুতে উজ্জ্বলতার মডেলিং করে ২০টি চিত্র থেকে একটি ত্রিমাত্রিক দৃশ্য পুনর্গঠন প্রক্রিয়া প্রদর্শন করে ।

অন্যদিকে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে ফার্স্ট রানার আপ” এর খেতাব অর্জন করে কসমস ক্রু, দলটিতে যৌথভাবে যুক্ত ছিলেন মহসিনা তাবাসসুম রিফা (CSE’19), মেফতাহুল জান্নাতী আনন্না (CSE’21), ফাতেমা তুজ জোহোরা মুন (CSE’21), মোঃ শিথিল ইসলাম (EEE’21) । উভয় দলের ডায়নামিক আইডিয়া উপস্থাপন বিচারকদের মুগ্ধ করেছে ।

এস.ই.সি প্রতিযোগিতাটির আয়োজক IEEE এরোস্পেস অ্যান্ড ইলেকট্রনিক সিস্টেম সোসাইটি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চ চ্যাপ্টার মনে করে, তাদের এই উদ্যোগের মাধ্যমে কমান্ড, কন্ট্রোল এবং কমিউনিকেশন সিস্টেম দ্বারা শক্তির রূপান্তর; বুদ্ধিমান প্রযুক্তি; নেভিগেশন এবং ট্র্যাকিং সিস্টেম; রাডার; রোবো মানব নির্মাণ বিদ্যা; স্পেস সিস্টেমের স্বয়ংক্রিয় পরীক্ষা পদ্ধতিসহ নানা জটিল পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির উদ্ভাবনে অভাবনীয় সাফল্য এনে দেবে । এছাড়াও এটি AESS শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন গতি তৈরি করবে এবং ইলেকট্রনিক সিস্টেমের ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার গড়তে উৎসাহিত করবে ।

ছেলের অভাবনীয় সাফল্যের অনুভূতি জানতে চাইলে ‘বাংলাদেশের খবর’ কে মাহান্না’র মা জানান “আমার নিজের কোন স্বপ্ন নেই, আমার ছেলে মেয়ের স্বপ্নই আমার স্বপ্ন, আমি চাই আমার ছেলে যেন ওর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে । একজন মানবিক ও উচ্চ মাপের গুণী মানুষ হতে পারে, যাকে নিয়ে মা হিসেবে শুধু আমি না, এদেশ যেন তাকে নিয়ে গর্ব করতে পারে ।” এছাড়াও উনার সাথে আলাপকালে জানা যায়, ছেলে মেয়েকে পড়াশোনায় যথা সম্ভব কিছুটা বেশি সময় প্রদান ও মনোযোগী রাখতে সরকারি শিক্ষকতা চাকুরী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন বখশ মোহাম্মদ মাহান্না’র স্নেহময়ী মা ইসমত আরা মুন্নি । সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসার এমন ত্যাগ, অন্যদিকে পড়াশোনা ও মেধায় বাচ্চাদের ঈর্ষণীয় সাফল্যের সংমিশ্রণ, নির্দ্বিধায় বলা যায় মাহান্নার বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণের দিকেই এগোচ্ছে ।।

স্যাটেলাইট অভিযান প্রতিযোগিতায় সেরা বিজয়ী ‘টিম অ্যাস্ট্রো থ্রাস্ট’ পরিবারের একজন হিসেবে তার অনুভূতি কেমন জানতে চাইলে ‘বাংলাদেশের খবর’কে বখশ মোহাম্মদ মাহান্না বলে “এত উচ্চ মাপের বিচারকদের সামনে কনসেপ্ট উপস্থাপন করতে পেরেছি, এটাই আমার কাছে অনেক কিছু । তার চেয়েও বড় কিছু তাদের সেটা পছন্দ হয়েছে‌।”

বখশ মোহাম্মদ মাহান্না’র ওভাবনীয় কৃতিত্বে মৌলভীবাজারবাসীসহ, স্কুল কলেজের বিভিন্ন শিক্ষক মন্ডলী, বন্ধুবান্ধব, পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি তাকে নিয়ে গর্ব করেন । তারা বলেন তার এ অর্জন আগামী দিনে দেশের জন্য বড় ধরনের সুনাম বয়ে আনবে । অন্যদিকে অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পড়াশোনার পাশাপাশি মহাকাশের কল্পনাকে সত্যি করে তুলতে জাতীয় স্যাটেলাইট অভিযান প্রতিযোগিতার আয়োজন শিক্ষার্থীদের সময়োপযোগী বাস্তব জ্ঞান অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ।