মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজারের প্রাচীন কয়েন ও সীমানা পিলার ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে বিপুল মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে প্রতারক চক্রের ৪ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে মৌলভীবাজার জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)পুলিশ ।
১ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) দুপুরে মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের হল রুমে সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নোবেল চাকমা এবিষয়টি জানান।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার বাংলা টিলা (পণ্ডিত নগর) গ্রামের বাসিন্দা এস.এম. ইলিয়াছুর রহমান (৩৬), শ্রীমঙ্গল থানার উত্তর ভাড়াউড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. ইকরাম মিয়া (২৮), ঢাকার মোহাম্মদপুর থানার শ্যামলী এলাকার বাসিন্দা তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামান (৬১), এবং ঢাকার মোহাম্মদপুর থানার মোহাম্মদিয়া হাউজিং এলাকার বাসিন্দা মো. ইব্রাহিম বেপারী (৩৭)।
গ্রেফতারের সময় তাদের কাছ থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত একটি এন্টিক পাওয়ার কয়েন (যাহার কথিত মূল্য ২০০ কোটি টাকা), একটি নোহা গাড়ী, একটি পকেট রাউটার, ৮টি মোবাইল ফোন, বিভিন্ন নামে ৫০০টি ভিজিটিং কার্ড, ৯৪ পাতা ভুয়া বিজনেস এগ্রিমেন্ট, ৩টি চেকবই, একটি কয়েন ব্ল্যাংক অ্যালবাম, একটি ডায়েরি, প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ১০টি সিমকার্ড, ১০০ টাকা মূল্যমানের ৬টি ভুয়া স্ট্যাম্প এবং ‘এন্টিক গ্যালারি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’-এর নামে একটি ভুয়া সার্টিফিকেট জব্দ করা হয়।
পুলিশ জানায়, তারা পৃথিবীর বিভিন্ন নামিদামী প্রতিষ্ঠান Heritage Auction, Lock Heed Martien, Black Rock, Microsoft ইত্যাদি কোম্পানীর বাংলাদেশের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসছে। ২০২৩ সালে ঢাকা ডিবি পুলিশের কাছে তাহের-উল- ইসলাম আখতারুজ্জামান, মিজানুর রহমান মজনসহ ৪ জন একই রকম প্রতারণার মামলায় গ্রেফতার হয়।
পুলিশ মামলার অভিযোগ সুত্রে জানায়, এস.এম. ইলিয়াছুর রহমানের মাধ্যমে মূল্যবান ধাতব বস্তু ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত চক্রের সদস্যদের সঙ্গে পরিচয় হয় মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার বালিসহস্র গ্রামের ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম (৩৫) এর।একপর্যায়ে চাতলাপুর চা বাগানের কয়েকজন ব্যক্তির কাছে ব্রিটিশ আমলের একটি মূল্যবান ধাতব বস্তু রয়েছে বলে তারা আব্দুর রহিমকে জানায়। যার মূল্য হাজার কোটি টাকারও বেশি। সেই বস্তুটি ক্রয় করতে ঢাকার একটি পার্টি আগ্রহী এবং বিশ্বস্ত ব্যক্তির মাধ্যমে লেনদেন সম্পন্ন করতে পারলে বিপুল পরিমাণ অর্থ লাভ করা যাবে বলে তারা তাকে প্রলোভন দেখায়।
প্রথমে বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হলেও পরবর্তীতে এস.এম. ইলিয়াছুর রহমানের আশ্বাসে আব্দুর রহিম বিষয়টি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য চক্রের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং তারই আমেরিকা প্রবাসী মামাতো ভাই মির্জা খালেদুর রহমানকে মধ্যস্থতা করার জন্য তার সাথে সম্পৃক্ত করে। চক্রের সদস্যরা তাদেরকে ঢাকার ক্রেতাদের সঙ্গে চাতলাপুর চা বাগানের ব্যক্তিদের মধ্যে লেনদেন করিয়ে দিতে পারলে তাদেরকে বিপুল অঙ্কের অর্থ মুনাফা হিসেবে দিবে বলে জানায় এবং তাদের পরিকল্পনা মতোই আব্দুর রহিমের মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে ঢাকার ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি পরিচয়ে তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামান যোগাযোগ করে। চক্রের সদস্য নিজেকে ‘US Heritage Auction’-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে পরিচয় দিয়ে মূল্যবান ধাতব বস্তুটি কিনতে আগ্রহী জানায়।
২০২৩ সালের আগস্ট মাসের ১৯ তারিখে আব্দুর রহিমসহ চক্রের সদস্যরা চাতলাপুর চা বাগানে যান। সেখানে তারা ধাতব বস্তুটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সেটি সঠিক ও মূল্যবান বলে জানায়।
বাগানের লোকজনের কাছ থেকে ধাতব বস্তুটি সংগ্রহ করতে ১ কোটি টাকার প্রয়োজন বলে আব্দুর রহিমের মামাতো ভাইয়ের কাছ থেকে ৪টি স্বাক্ষরিত চেক নেয়। চেকগুলো গ্রহণের পরও চক্রটি প্রতিশ্রুত অর্থ প্রদান করেনি।
পরে ঐবছরের ২৭ অক্টোবর ধাতব বস্তুটি পুনরায় পরিক্ষা নিরিক্ষার জন্য চক্রটি চাতলাপুর চা বাগানে যায়। পরিক্ষা শেষে বস্তুটি সঠিক আছে বলে তারা
জানায়।
পরে বস্তুটি হস্তান্তরের কথা বলে আব্দুর রহিম ও তার মামাতো ভাইয়ের কাছ থেকে চক্রটি নগদ ২ কোটি টাকা নেয়। একই সাথে চক্রের সদস্যরা আরও দেড় কোটি টাকা প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করে। এরপর বক্সটি তাদের হেফাজতে দিয়ে দুই দিন পর আরও ১০ কোটি টাকা প্রদান করে কথিত মূল্যবান বস্তুটি নিয়ে যাওয়ার কথা জানায়। বিষয়টি বিশ্বাস করে আব্দুর রহিম বক্সটি সিলেটে নিয়ে নিজেদের হেফাজতে রাখে।
পরে মূল্যবান ধাতব বস্তুটি যাচাই করার জন্য বক্সটি খোললে বক্সের ভেতরে তারা সাপ দেখতে পায়। এতে আব্দুর রহিম ও তার মামাতো ভাই প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে চক্তটির সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে কিছুদিন পরে এটা পুনরায় মূল্যবান বস্তুতে পরিনত হবে বলে তারা আশ্বস্ত করে।
পরে কথিত মূল্যবান বস্তু এবং টাকা ফেরত নিতে চক্রটির সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করলে মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এভাবে চক্তটি বিভিন্ন সময়ে প্রায় ২ কোটি ২১ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে জানা যায়। এই ঘটনায় কুলাউড়া থানায় ২০২৪ সালে একটি মামলার দায়ের করা হয়।
মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নোবেল চাকমা বলেন, ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতারণার এই ধরনের নতুন কৌশল সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। অস্বাভাবিক লাভের প্রলোভনে পড়ে কোনো ধরনের লেনদেন না করার জন্য তিনি অনুরোধ জানান।