মো. রুহুল আলম রনি, মৌলভীবাজার:
মৌলভীবাজার জেলায় গত দুই মাসে হামের উপসর্গ নিয়ে ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ল্যাব পরীক্ষায় ১৬ জনের হাম ও ২ জনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ব্যাপক হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করেছে এবং ইতোমধ্যে লক্ষ্যমাত্রার ৯৯ শতাংশ অর্জনের দাবি করেছে।
মৌলভীবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৯ জুন পর্যন্ত জেলায় মোট ৮৪ জন সন্দেহভাজন হাম ও রুবেলা রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ১৬ জনের শরীরে হাম এবং ২ জনের শরীরে রুবেলার উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে।
উপজেলাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, কুলাউড়া ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ৫ জন করে হাম আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন। এছাড়া রাজনগরে ৩ জন, শ্রীমঙ্গলে ২ জন এবং কমলগঞ্জে ১ জন আক্রান্ত হয়েছেন। রুবেলায় আক্রান্ত দুইজনই বড়লেখা উপজেলার বাসিন্দা।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে ৯ জুন পর্যন্ত সময়ে জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে তিনজন শিশুর শরীরে ল্যাব পরীক্ষায় হাম পজিটিভ পাওয়া যায়। মৃত্যুবরণকারী শিশুদের মধ্যে শ্রীমঙ্গলে ৩ জন, কুলাউড়ায় ২ জন, মৌলভীবাজার সদরে ২ জন, রাজনগরে ১ জন এবং কমলগঞ্জে ১ জন রয়েছে। এছাড়া মৃত শিশুদের মধ্যে দুইজন সিলেটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলেও তাদের বাড়ি মৌলভীবাজার জেলায়।
আক্রান্তদের বয়স বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৯ মাসের কম বয়সী ৭ শিশু, ২ বছরের কম বয়সী ২ শিশু এবং ২ বছরের বেশি বয়সী ৭ জন আক্রান্ত হয়েছে। টিকাদান অবস্থার তথ্য অনুযায়ী আক্রান্তদের মধ্যে ৮ জন কোনো টিকাই গ্রহণ করেনি, ৪ জন এক ডোজ এবং ৪ জন দুই ডোজ টিকা গ্রহণ করেছিল।
হামের বিস্তার রোধে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ব্যাপক টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ২০ মে ২০২৬ তারিখের এমআর ক্যাম্পেইন রিপোর্ট অনুযায়ী, জেলায় মোট ২ লাখ ৪ হাজার ৯২৮ জন শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ২ লাখ ২ হাজার ৯৫০ জন শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৯৯ দশমিক ০৩ শতাংশ।
উপজেলাভিত্তিক অর্জনের মধ্যে বড়লেখায় ১০২ দশমিক ৮১ শতাংশ, বড়লেখা পৌরসভায় ৯৮ দশমিক ৮২ শতাংশ, জুড়ীতে ৯৭ দশমিক ২৫ শতাংশ, কুলাউড়ায় ৯৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ, রাজনগরে ৯৭ দশমিক ২৮ শতাংশ, কমলগঞ্জে ৯৮ দশমিক ৭১ শতাংশ, মৌলভীবাজার সদরে ৯৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ, সদর পৌরসভায় ১১৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ, শ্রীমঙ্গলে ৯৮ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং শ্রীমঙ্গল পৌরসভায় ১০৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ অর্জন হয়েছে।
বর্তমানে জেলা সদর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ২০ বেডের আইসোলেশন ইউনিট এবং প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০ বেডের আইসোলেশন ইউনিট প্রস্তুত রাখা হয়েছে। হামের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, “জেলায় হামের টিকা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং এমআর টিকাদান কর্মসূচির ৯৯ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। টিকা গ্রহণের পর সম্পূর্ণ কার্যকারিতা পেতে সাধারণত এক মাস সময় লাগে। আমরা হামের বিস্তার রোধে নিবিড় নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছি। একই সঙ্গে ডেঙ্গু, হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “যাদের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দিচ্ছে তাদের মাস্ক ব্যবহার, জনসমাগম এড়িয়ে চলা এবং দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”
মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. প্রণয় কান্তি দাস বলেন, “সারা দেশের মতো মৌলভীবাজার জেলাতেও হামের রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত প্রায় আড়াই মাস ধরে আমাদের হাসপাতালে হাম রোগীদের জন্য পৃথক আইসোলেশন ইউনিট চালু রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে মোট ২৯৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে অধিকাংশই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তবে কয়েকজন রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেটের বিশেষায়িত হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে হাসপাতালে হাম রোগীদের জন্য ২০টি আইসোলেশন বেড রয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে এবং রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে প্রয়োজন অনুযায়ী বেড সংখ্যা আরও বাড়ানোর সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। রোগীদের সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে।”
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ অভিভাবকদের শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনার পাশাপাশি জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে দানা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।