মৌলভীবাজারে বানের জলে ভেসে গেল কৃষকের স্বপ্ন, এখন রোগ-ক্ষুধা আর ঋণের সঙ্গে লড়াই: পানি নামলেও কাটেনি দুর্ভোগ

admin
প্রকাশিত July 13, 2026
মৌলভীবাজারে বানের জলে ভেসে গেল কৃষকের স্বপ্ন, এখন রোগ-ক্ষুধা আর ঋণের সঙ্গে লড়াই: পানি নামলেও কাটেনি দুর্ভোগ

মৌলভীবাজারে মনু ও ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে সৃষ্ট বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। কিন্তু পানি যত কমছে, ততই সামনে আসছে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। বিস্তীর্ণ ফসলি জমি কাদায় ঢেকে গেছে, নষ্ট হয়েছে রোপা আমনের বীজতলা, সবজি ক্ষেত, পানের বরজ, পেঁপে বাগান ও মাছের পুকুর। কয়েক দিনের বন্যায় বহু কৃষকের বছরের একমাত্র সম্বল মুহূর্তেই হারিয়ে গেছে। অন্যদিকে বিশুদ্ধ পানির সংকট ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ডায়রিয়া, ডিসেন্ট্রি, সর্দি-জ্বর ও অ্যালার্জিসহ পানিবাহিত রোগ বাড়তে শুরু করেছে। ফলে বন্যা-পরবর্তী সময়ে নতুন সংকটে পড়েছেন দুর্গত মানুষ।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মনু ও ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে গত বৃহস্পতিবার জেলা সদর, রাজনগর, কমলগঞ্জ ও কুলাউড়া উপজেলার ২৮টি ইউনিয়নের প্রায় ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন প্রায় দুই হাজার মানুষ। বর্তমানে পানি কমতে শুরু করলেও অধিকাংশ এলাকায় কাদা, আবর্জনা ও দূষিত পানির কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এখনো ব্যাহত।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে কৃষি খাতে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রাজনগর উপজেলায় প্রায় ৬০ হেক্টর রোপা আমনের আবাদ এবং কমলগঞ্জ উপজেলায় ৮৩ হেক্টর বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এছাড়া এখনও অনেক কৃষিজমি পানির নিচে থাকায় প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সরেজমিনে রাজনগর ও কমলগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, যেখানে কয়েক দিন আগেও সবুজ ধানের চারা দুলছিল, সেখানে এখন কেবল কাদা আর পচে যাওয়া গাছপালা। সবজি ক্ষেত নিশ্চিহ্ন, মাছের পুকুর ভেসে গেছে, পানের বরজ ও ফলের বাগান নষ্ট হয়েছে। অনেক কৃষক জমিতে দাঁড়িয়ে নীরবে ক্ষতির হিসাব কষছেন।

রাজনগরের সৈয়দনগর এলাকার এক কৃষক বলেন, “বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে বীজ কিনে জমি আবাদ করার মতো টাকা নেই। এখন কীভাবে চাষ করব বুঝতে পারছি না।”

একজন বর্গাচাষী অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, “ঋণ নিয়ে চাষ করেছিলাম। এখন ফসল নেই, টাকা নেই। ঋণ শোধ করব কীভাবে, পরিবার চালাব কীভাবে—কিছুই বুঝতে পারছি না।”

কমলগঞ্জ উপজেলার এক কৃষক বলেন, “বন্যার পানিতে শাকসবজি, বীজতলা সব শেষ। সামনে কী হবে, তা ভেবেই ভয় লাগছে।”

আরেক বর্গাচাষী বলেন, “অন্যের জমিতে চাষ করে সংসার চলে। এবার সব ভেসে গেছে। নতুন করে আবাদ করতে না পারলে পরিবার নিয়ে অনাহারে থাকতে হবে।”

বন্যার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে দেখা দিয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। দুর্গত এলাকার বিভিন্ন বাড়িতে ডায়রিয়া, ডিসেন্ট্রি, সর্দি-জ্বর ও অ্যালার্জির রোগী বাড়ছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

রাজনগরের কামারচাক ইউনিয়নের এক বাসিন্দা বলেন, “পানি কমেছে, কিন্তু এখন প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কেউ না কেউ অসুস্থ। শিশুদের ডায়রিয়া হচ্ছে, অনেকের জ্বর ও চর্মরোগ দেখা দিয়েছে।”

মৌলভীবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, “বন্যায় কৃষকদের বীজতলার ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে বিস্তারিত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।”

জেলা সিভিল সার্জন মো. মামুনুর রহমান বলেন, “বন্যাকবলিত এলাকায় মেডিকেল টিম কাজ করছে। পর্যাপ্ত ওষুধ মজুত রয়েছে। বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য সবাইকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”

জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, “দুর্গত মানুষের জন্য চাল, শুকনো খাবার ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মেডিকেল টিম কাজ করছে। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও প্রয়োজনীয় সহায়তায় প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।”

বন্যার পানি নেমে গেলেও কৃষকের চোখের পানি এখনো শুকায়নি। মাঠজুড়ে পড়ে আছে ধ্বংসস্তূপ, আর ঘরে ঘরে অনিশ্চয়তার দীর্ঘশ্বাস। এখন তাদের একটাই প্রত্যাশা—দ্রুত সরকারি সহায়তা, নতুন বীজ, কৃষি পুনর্বাসন এবং কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা। কারণ এই সহায়তা না মিললে শুধু একটি মৌসুম নয়, অনেক কৃষকই হারাতে পারেন তাদের আগামী দিনের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x